Home / আর্টিক্যাল/ব্লগ / অন্ত্রের ভয়াবহ রোগ আলসারেটিভ কোলাইটিস :

অন্ত্রের ভয়াবহ রোগ আলসারেটিভ কোলাইটিস :

আধুনিক মেডিকেল টার্মে ইনফ্লামেটরি বাওয়েল ডিজিজ (আইবিডি) Inflammatory bowel disease (IBD) একটি রূপই হলো Ulcerative Colitis আলসারেটিভ কোলাইটিস। আমাদের কোলন বা বৃহদান্ত্রের প্রদাহকেই মূলত কোলাইটিস বলা হয়ে থাকে। এ রোগে বৃহদান্ত্রের প্রদাহ হয়ে অন্ত্রের মিউকাস মেমব্রেনে ক্ষত সৃষ্টি করে। কোন অঞ্চলে হয়েছে এবং রোগের তীব্রতার ওপর নির্ভর করে এর ধরন নির্ণয় করা হয়। যেমন –

  • আলসারেটিভ প্রক্টাইটিস (Ulcerative proctitis) – এনাস বা মলদ্বার পর্যন্ত সীমিত থাকে
  • প্রক্টসিগময়েডাইটিস (Proctosigmoiditis) – রেক্টাম ও সিগময়েডের সাথে জড়িত
  • লেফট সাইডেড কোলাইটিস (Left-sided colitis) – বাঁম দিকের কোলনটি জড়িত থাকা
  • প্যানকোলাইটিস (Pancolitis) – পুরো কোলনকেই আক্রান্ত করা
  • অ্যাকিউট সিভিয়ার আলসারেটিভ কোলাইটিস (Acute severe ulcerative colitis) – পুরো কোলনকেই আক্রান্ত করে ফেলা।

পাকস্হলী বা পেটের একটি দুরারোগ্য পীড়া বলেই বিবেচিত হয় আলসারেটিভ কোলাইটিস। হোমিওপ্যাথি ছাড়া প্রচলিত অন্যান্য ট্রিটমেন্টের সিস্টেমে এর তেমন কোন ভাল চিকিৎসা নেই বললেই চলে এক্ষেত্রে প্রপার হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা নিলেই এই সমস্যাটি ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যায়। অন্য সকল চিকিৎসা শাস্ত্রে এই রোগের উপসর্গকে সাময়িক ভাবে দমিয়ে রাখার চিকিৎসা দিয়ে থাকে এবং সাথে সাথে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনতে উপদেশ দিয়ে থাকে।

ইউরোপ ও আমেরিকায় এ রোগটি দেখা গেলেও আমাদের উপমহাদেশের জনগণের মধ্যে তেমন দেখা যেত না। তাই আমাদের দেশের মানুষের এই অসুখটির সাথে খুব একটা পরিচিতি ছিল না। তবে বর্তমানে পশ্চিমা দেশগুলোর খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতি অনুকরণের ফলে আমাদের দেশের মানুষের মধ্যেও আলসারেটিভ কোলাইটিস হতে দেখা যাচ্ছে।

আলসারেটিভ কোলাইটিস হচ্ছে পেটের প্রদাহজনিত যন্ত্রণাদায়ক সমস্যা। এর ফলে কোলনে প্রদাহ ও ঘা হয় যা রোগীর পেটে মর্মান্তিক ব্যথার সৃষ্টি করে। ছোট ছোট আলসার বা ঘা গুলি পুরো কোলনকে ক্ষতিগ্রস্থ করে। আলসারগুলি একে অন্যের সাথে আটকে থাকে। এই রোগ জিন গত কারণে বা পরিবেশ গত কারণে হতে পারে। নিন্মে এর আলামতগুলি উল্লেখিত হলো :                      ১। ডায়রিয়ার সাথে রক্ত পড়া বা রক্ত আমাশয় হলো আলসারেটিভ কোলাইটিসের অন্যতম প্রধান লক্ষণ।

২। রক্ত বা পুঁজ মিশ্রিত পাতলা পায়খানা হতে থাকা।

৩। রোগের তীব্রতা কম থাকলে দিনে মোটামুটি ৪/৫ বার পাতলা পায়খানা হতে পারে।

৪। রোগের তীব্রতা খুব বেশি হলে দিনে ৬ – ১০ বার পর্যন্ত পায়খানা হতে পারে।

৫। পায়খানার সাথে আমাশাও থাকতে পারে।

৬। মলদ্বার দিয়ে অনেক সময় মিউকাস বের হয়।

৭।পায়খানার বেগ আসা মাত্রই টয়লেটে ছুটতে হয়।

৮। তলপেটে মোচড় দেয় এবং অনেক সময় তীব্র পায়খানার বেগ হয় যা সহ্য করা যায়না।

৯। সাধারণতঃ তলপেটের বাম পাশে ব্যথা থাকে যা পায়খানা হবার পর কিছুটা কমে যায়।

১০। গায়ে জ্বর থাকতে পারে।

১১। পায়খানার সাথে রক্ত যাবার ফলে রোগীর দেহে রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়।

১২। মলদ্বারে প্রায় ব্যথা হতে পারে।

১৩। অরুচি, অস্বস্তি হয়, ওজন কমে যেতে থাকে।

আলসারেটিভ কোলাইটিস হচ্ছে ইনফ্ল্যামেটোরি বাওয়েল ডিজিজ (আইবিডি)’র একটি রূপ কিন্তু তা ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম(IBS) ক্রনিকস ডিজিজ থেকে আলাদা। ইরিটেব্‌ল বাওয়েল সিনড্রোম হলো একটি পরিচিত পেটের পীড়া যা পাতলা পায়খানা, কোষ্ঠকাঠিন্যসহ পেটের আরো কিছু উপসর্গ সৃষ্টি করে। যাই হোক, আলসারেটিভ কোলাইটিস-এ বৃহদন্ত্রের প্রদাহ, ঘা এবং ক্ষত দেখা যায়।

ক্রনিকস ডিজিজে পরিপাক নালীর যেকোন অংশকে আক্রমণ করতে পারে কিন্তু আলসারেটিভ কোলাইটিস প্রধানতঃ বৃহদন্ত্রের নীচের অংশ (মলদ্বার) আক্রমণ করে। কিছু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এটা সম্পূর্ণ কোলনকে আক্রমণ করতে পারে।

আলসারেটিভ কোলাইটিস এর কারণ : আলসারেটিভ কোলাইটিসের নির্দিষ্ট কারণ এখনো মেডিকেল সাইন্সে অজানা। তবে কিছুক্ষেত্রে চিন্তা করে যে সব কারণে রোগটি হবার সম্ভাবনা বেশি দেখা যায় সেগুলি হল –

  • জিনগত বা পারিবারিক ইতিহাস
  • অত্যধিক মানসিক দুশ্চিন্তা
  • ইনফেকশন জনিত কারণ
  • গ্যাসট্রোএন্টেরাইটিস জনিত কারণ
  • অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ গ্রহণ
  • NSAID গ্রুপের ওষুধ অত্যধিক গ্রহণ ইত্যাদি।
আলসারেটিভ কোলাইটিস রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা :
  • রক্ত পরীক্ষা করলে হিমোগ্লবিন কমে যায় এবং ইএসআর বেড়ে যায়
  • সিগময়ডোস্কোপি
  • কোলোনোস্কপি
  • বেরিয়াম এনেমা
  • আলট্রাসনোগ্রাফি
  • এমআরআই
  • সিআরপি প্রভৃতি।

কোলনোস্কপি এবং সিগময়েডোস্কপি যান্ত্রিক এই পদ্ধতি ছাড়া আর কোনও বিকল্প নেই এই রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে। প্রথমে কোলনোস্কপিই করা হয়। এই রিপোর্টে পুরো কোলন ক্ষতিগ্রস্ত ধরা পড়লে, বারবার কোলনোস্কপিই করতে হয়। আর কোলনের বাঁ দিকটা ক্ষতিগ্রস্ত কি না সেটা দেখতে করা হয় সিগময়েডোস্কপি।

আলসারেটিভ কোলাইটিসের জটিলতা : সময় মতো চিকিৎসা না করলে বিভিন্ন জটিলতা তৈরী হতে পারে যদিও জটিলতাগুলি ব্যক্তি বিশেষে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে।

  • কোলন ক্যান্সার হতে পারে
  • দেহের বিভিন্ন জয়েন্টে ব্যথা হতে পারে, যেমন-কোমর,মেরুদণ্ড, হাঁটু, পায়ের গোড়ালি, হাতের জয়েন্টে,এলবো জয়েন্ট।
  • চামড়ার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের লাল দাগ অথবা আলসার হতে পারে
  • চোখের বিভিন্ন ধরনের প্রদাহজনিত রোগ হয়ে অন্ধ হয়ে যেতে পারে
  • মুখ, হাত ও পায়ে পানি এসে শরীর ফুলে যেতে পারে এবং
  • জন্ডিস হতে পারে, লিভারের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হয় লিভার নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

আলসারেটিভ কোলাইটিসের চিকিৎসা :

হোমিওপ্যাথি ছাড়া অন্যান্য চিকিৎসা শাস্ত্রে আলসারেটিভ কোলাইটিসের কোন স্থায়ী চিকিৎসা নেই। বর্তমান বিশ্বে এর একমাত্র স্থায়ী চিকিৎসা হলো হোমিওপ্যাথিক  চিকিৎসা। অন্য শাস্ত্রে এই সমস্যার উপসর্গকে দমিয়ে রাখার চিকিৎসা দেয়া হয়ে থাকে এবং জীবন যাত্রার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়ে থাকে। কিন্তু রোগীর নিজের বিস্তারিত জেনে এবং নিকট আত্মীয়ের হিস্ট্রি পর্যালোচনা করে যত্ন নিয়ে চিকিৎসা করলে ধীরে ধীরে এই সমস্যা স্থায়ীভাবে সেরে উঠে একমাত্র হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায়।

Check Also

এনাল ফিস্টুলা বা ভগন্দরের পরিচয় :

এনাল ফিস্টুলা (anal fistula) বা ভগন্দর : এটি পায়ুপথের একটি বিরক্তিকর রোগ, যার উপস্থিতি রোগীর …