Home / আর্টিক্যাল/ব্লগ / এনাল ফিসারের A to Z

এনাল ফিসারের A to Z

আজকের বিষয় এনাল ফিসার : এনাল ফিসার বা মলদ্বার ফাটা একটি কমন মলদ্বার ব্যাধি।মুলতঃ মলদ্বারের মুখের চর্মের সন্ধিস্হলের বার বার ফেটে যাওয়া জনিত একপ্রকার কষ্টকর রোগ। একটি গবেষণায় দেখা গেছে বিশ্বে প্রতি এক হাজার জনে ২/৪ জন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এই রোগে ভোগেন।
শিশু থেকে বৃদ্ধ যে কোনো বয়সের নারী পুরুষ নির্বিশেষে যে কেউ এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তবে অপেক্ষাকৃত তরুণদের মধ্যে এ রোগের প্রকোপ বেশি দেখা যায়।
— কারণ : কোষ্ঠকাঠিন্য এই রোগের প্রধান কারণ। তবে অতিরিক্ত ডায়েরিয়া বা কোষ্ঠবদ্ধতা হলেও এনাল ফিসার হতে পারে। মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দিয়ে মলত্যাগের বদভ্যাস এই রোগের সম্ভাবনাকে বাড়ায়। মলদ্বারের সামনে-পিছনে যেকোনো দিকে এ ফাটা হতে পারে।
তবে মহিলাদের ক্ষেত্রে কখনও কখনও বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় মলদ্বার সামনে, পিছনের দিকে ফেটে যেতে পারে। মলদ্বারের টিবি, যৌন বাহিত রোগ, ক্যান্সার ইত্যাদি রোগের কারণেও অনেক সময় মলদ্বারের পাশে ফাটা, ঘা দেখা দেয়।
——– প্রকারভেদে উপসর্গ সমূহ :———
এনাল ফিসার দুই ধরনের হয়ে থাকে–
১। একিউট বা হঠাৎ সঙ্কট জনক হয়ে ওঠা ফিসার (Acute Fissure)।
২। ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী ফিসার (Chronic Fissure)।
এই রোগের প্রধান উপসর্গই হলো ব্যাথা। এছাড়া রক্তক্ষরণ,জ্বালা, ব্যাথা, চুলকানি, মলদ্বারে শ্লেষ্মা বা পিচ্ছিল পদার্থ যাওয়া, মলদ্বারের পাশে বাড়তি উপমাংস এবং কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়েও রোগীরা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।
১. একিউট বা হঠাৎ সঙ্কটজনক হয়ে ওঠা ফিসার (Acute Fissure) : তীব্র ব্যাথা এই রোগের প্রধান লক্ষণ। মলত্যাগের পরপর এই ব্যাথা শুরু হয় এবং দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত এব্যাথা থাকে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাথার সঙ্গে জ্বালাপোড়া হতে থাকে। ব্যাথা অনেক ক্ষেত্রে এতটাই তীব্র হয় যে অনেক রোগী বাথরুমে যেতে ভয় পান। এই রোগে রক্তক্ষরণের পরিমাণ সাধারণত কম। বেশিরভাগ রোগী অভিযোগ করেন মলত্যাগের পর টিস্যু ব্যবহার করলে রক্ত দেখা যায়। অল্প কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়। মলদ্বারে শ্লেষ্মা বা পিচ্ছিল পদার্থ যেতে পারে।
২. ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী ফিসার (Chronic Fissure) : ছয় সপ্তাহের বেশি ফিসারকে দীর্ঘস্থায়ী ফিসার বলা হয়। দীর্ঘস্থায়ী ফিসারে ব্যাথা অল্প কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যাথা নাও হতে পারে। অধিকাংশ রোগী মলদ্বারের পাশে বাড়তি মাংস বা উপমাংস (Sentinel Piles) আছে বলে অভিযোগ করেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মলদ্বারের ভেতরেও বাড়তি মাংস বা উপমাংস (Hypertrophied Anal Papilla) থাকতে পারে। অনেক সময় রোগীরা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার পর মলদ্বারে ব্যাথা অথবা জ্বালা, মলদ্বার সামান্য ভেজা ভেজা ভাব অথবা মলদ্বারে চুলকানি অনুভব করেন।
দুই ধরনের ক্ষেত্রেই ফিসার সংক্রমিত হয়ে ফোঁড়া (Abscess), পুঁজ পড়া কিংবা ফিস্টুলায় রুপান্তরিত হতে পারে। পুরুষদের ক্ষেত্রে অনেকে প্রশ্রাবের সময় এবং নারীরা অনেকে যৌন মিলনের সময় ব্যাথা অনুভব করেন।
——–রোগ নির্ণয়(Diagonosiss):———–
রোগীর উপর্সগ শুনে এবং মলদ্বার পরীক্ষা করে চিকিৎসকরা বেশীরভাগ সময় রোগ নির্ণয় করে থাকেন। মলদ্বার না দেখে শুধুমাত্র শুনে চিকিৎসা করা অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়ার মতো। কেননা মলদ্বার দেখেই চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন যে রোগীর মলদ্বারের টিবি, যৌন বাহিত রোগ, ক্যান্সার ইত্যাদি রোগের কারণে হওয়া ফিসার নির্ণয়ে রোগীর জন্য কোনো পরীক্ষা (সিগময়ডোস্কোপি / কোলনস্কোপি ) প্রয়োজন কিনা।সুতরাং রোগী দেখার কোন বিকল্প নেই।
——প্রতিরোধ বা প্রতিকার :———
প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। প্রতিরোধের জন্যে নিন্মোক্ত বিষয়গুলো মেনে চলা যেতে পারে :
১• কোষ্ঠকাঠিন্য যাতে না হয় সে ব্যবস্থা করা।
২• অতিরিক্ত চাপ দিয়ে মলত্যাগের বদভ্যাস ত্যাগ করা।
৩• বারে বারে মলত্যাগের অভ্যাস ত্যাগ করা বা অতি কোথ দেয়া।
৪• নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন।
৫• অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা না করা।
৬• ডায়রিয়া হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া।
৭.কায়িক শ্রম বা ব্যায়াম করা।
—— চিকিৎসা(Treatment) :———
প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগ সংক্রান্ত জটিলতা এড়ানো সম্ভব। প্রাথমিক অবস্থায় পরিমিত (Conservative) চিকিৎসায় ফিসার সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। পরবর্তী সময়ে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন করে রোগমুক্ত থাকা সম্ভব। প্রাথমিক অবস্থায় অল্প ব্যাথা এবং রক্তপাত হয় বিধায় অধিকাংশ মানুষ বিষয়টি অবহেলা করেন। অথচ এ সময় মল নরম করার ওষুধ, ব্যাথানাশক ওষুধ এবং স্থানিক মলম, লোশন ব্যবহার করে রোগটির চিকিৎসা সম্ভব।
সিজ/ হিপ বাথ (Stiz/Hip Bath) এবং আঁশজাতীয় খাবার বেশি করে গ্রহণ করে রোগীরা উপকার পান। এক গামলা কুসুম গরম পানিতে সামান্য লবণ, পভিসেপ দ্রবণ বা ডেটল মিশিয়ে মলত্যাগের পর ১০ থেকে ১৫ মিনিট নিতম্ব বা পাছা ডুবিয়ে বসে থেকে সিজ/হিপ বাথ নেওয়া যায়। দীর্ঘস্থায়ী ফিসার নির্মূলে দীর্ঘস্হায়ী চিকিৎসা নেয়া প্রয়োজন। কেননা দীর্ঘ দিন ভোগার কারণে মলদ্বার সংকুচিত (stonosiss) হয়ে যায় এবং মলদ্বারের পাশে মাংস বেড়ে (Sentinel Piles) যায়।
অপারেশনের ব্যাপারে স্বাভাবিক ভাবেই মানুষের ভীতি রয়েছে। উপরন্তু অপারেশনের পর সুস্থ হবে কিনা কিংবা মল ধরে রাখতে কোনো অসুবিধা হবে কিনা ইত্যাদির ভয়ে রোগীরা চিকিৎসকের কাছে যান না, এমনকি অনেকে ১৫ থেকে ২০ বছরও এ রোগ লালন পালন করেন। তবে আজকাল অপারেশন ছাড়াও অল্টারনেটিভ চিকিৎসা হিসাবে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় অতিদ্রুত ও স্হায়ীভাবে এনাল ফিসারের চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হচ্ছে। তাই আসুন এনাল ফিসারকে ভয় না করে-জয় করি।
আমাদের দেশের রোগীরা এত দেরি করে চিকিৎসকের কাছে আসেন যে, রোগটি জটিল হয়ে এইসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। পরিশেষে বলা যায় যে রোগ নিয়ে অবহেলা না করে দ্রুত একজন মলদ্বারের চিকিৎসায় পারদর্শী রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সুস্থ থাকুন,নিজে জানুন এবং অপরকে জানান। লেখক : ডাঃ একেএম ফজলুল হক সিদ্দিকী (পাইলস ও মলদ্বার গবেষক, চিকিৎসক, কলামিস্ট)

Check Also

মলদ্বার বা পায়ুপথের নানান ব্যাধি :

মলদ্বারে বা পায়ুপথে নানাবিধ কারণে ব্যথা হয়ে থাকে। পায়ুপথের ব্যথার প্রধান কারণগুলো হচ্ছে (১) পায়খানার …