Home / আর্টিক্যাল/ব্লগ / পাইলসের কিছু কমন বিষয় :

পাইলসের কিছু কমন বিষয় :

পাইলস্ বা অর্শ সম্পর্কে সাধারণ  মানুুষের অনুমান- মলদ্বারের চুলকানি, চাকা হওয়া, ব্যথা, ফুলে যাওয়া, রক্তপড়া, মলদ্বার ঝুলে পড়া ইত্যাদি। অথচ পাইলসের শিরাগুলি সাধারণভাবে সবার শরীরেই বিদ্যমান। পাইলসের উপসর্গগুলি পশ্চিমা সভ্যতায় খুবই সাধারণ। এ সমস্যাটি যে কোনো বয়সে যে কোনো লিঙ্গেরই হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে ৪.৪% লোকের পাইলসের সমস্যা রয়েছে। পঞ্চাশোর্ধ্ব লোকদের ৫০% কোনো না কোনো সময় পাইলসের উপসর্গ অনুভব করেন। উচ্চবিত্ত লোকদের এই রোগটি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কারণ পাইলস কোনো বিশেষ একটি কারণের জন্য হয় না। অনেকগুলো কারণ এ জন্য দায়ী। যার অন্যতম হচ্ছে উত্তরাধিকার, গঠনগত বৈশিষ্ট্য, পুষ্টি, পেশা, আবহাওয়া, মানসিক সমস্যা, বার্ধক্য, হরমোনের পরিবর্তন, খাদ্য ও ওষুধ, সংক্রমণ, অন্তঃসত্ত্বা, ব্যায়াম, কাশি, মলত্যাগের শক্তিপ্রয়োগ, বমি, আঁটসাঁটো কাপড় পরা ও কোষ্ঠকাঠিন্য। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেহের গঠনকে ধরে রাখার কোষ-কলার ক্ষয় হতে থাকে যার কারণে মলদ্বারের ভেতরের শিরা বা কোশনটি ঢিলা হয়ে ঝুলে পড়তে থাকে। এমতাবস্থায় শিরাগুলি আস্তে আস্তে স্ফীত হতে থাকে এবং রক্তপাত শুরু হতে থাকে। উপসর্গ ও লক্ষণসমূহ  : এ রোগের রোগীরা  প্রায়শঃ ক্ষেত্রে মলদ্বার দিয়ে রক্ত পড়ার অভিযোগ করেন। এটি সাধারণত মলত্যাগের সময় অথবা পরে হয়ে থাকে। মলত্যাগের  সময় শক্তি প্রয়োগ করা অথবা  ঘনঘন  মলত্যাগ করলেও রক্ত যাওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।  রক্তপাত কমোডে বা টয়লেট পেপারে দেখা যেতে পারে।  কিছু কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত রক্ত যাওয়ার কারণে তীব্র রক্তশূন্যতা দেখা দিতে পারে। পাইলসে সাধারণত ব্যথা হয় না, কিন্তু যদি ব্লাড থ্রম্বোসিস (রক্ত জমাট বাঁধা) অথবা পচন ধরে তখনি ব্যথা হতে পারে। সাধারণত মলদ্বারে ব্যথার প্রধান কারণ এনাল ফিশার। মলদ্বারের ভেতর থেকে মাংসপিন্ড ঝুলে পড়া বা গেজ হওয়া একটি সাধারণ ঘটনা। এটি হলে কখনও কখনও হাত দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দিতে হয়। এমনও হতে পারে যে এটা বাইরে ঝুলে আছে এবং কখনও ভেতরে যায় না তখনি ভয়াবহ  ব্যাপার। মাঝে মধ্যে মলদ্বারে চুলকানি হতে পারে। পাইলসের জন্য কোষ্ঠকাঠিন্য হয় না কিন্তু কোষ্ঠবদ্ধতার কারনে  পাইলস  হয়ে থাকে। ঘন ঘন পায়খানা হলে অথবা থ্রম্বসিস হলে অনেকে রক্তপড়া বা ব্যথার জন্য টয়লেটে যেতে চায় না যার জন্য আস্তে আস্তে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা  :  মলদ্বারে রক্ত পড়ার অনেক কারণ আছে তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে পায়ুপথের ক্যান্সার। সিগময়ডস্কপি-মলদ্বার,পায়ুপথ ও বৃহদান্ত্রের ভেতরে এ যন্ত্র দিয়ে পরীক্ষা করতে হয়। প্রকটস্কপি- এ যন্ত্র দিয়ে মলদ্বার ও পায়ুপথের নিচের দিক পরীক্ষা করতে হয়। রোগী যদি ৫০ বছর বয়সের ঊর্ধ্বে হয় এবং যদি পরিবারে কেউ বৃহদান্ত্র ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে থাকে তাহলে  তার বেরিয়াম এনেমা বা কোলনস্কপি করা উচিত।
চিকিৎসা ও প্রতিরোধ : কিছু অভ্যাস এবং উপদেশ পালন করলে অনায়েশে পাইলস প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব । আঁশ জাতীয় খাবার যেমন শাকসব্জি, ইসপগুলের ভুসি এ ব্যাপারে উপকারী। আফ্রিকায় কিছু সম্প্রদায় আছে যারা মূলত শাকসব্জি ও ফলমূলের ওপর নির্ভর করে। এদের সাধারণত পাইলস দেখা যায় না। টয়লেটে অনেকক্ষণ বসে বসে কোঁথ দেয়া বা অহেতুক দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা উচিত নয়। কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়েরিয়ার ক্ষেত্রে সময়মতো যথাযথ চিকিৎসা করা উচিত। মাংস বিশেষত গরু এবং খাসির মাংস কম খাওয়া উচিত। ডায়রিয়া বা আমাশয়ের চিকিৎসা যথাসময়ে করিয়ে নেয়া উচিত। পাইলসের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন চিকিৎসা রয়েছে। যদি কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় তার চিকিৎসা করতে হবে যেমন ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য। ক্যান্সার অথবা বৃহদান্ত্রের অন্য কোনো রোগ আছে কিনা অবশ্যই দেখে নিতে হবে।
ওষুধ ও পথ্যের সাহায্যে পাইলস চিকিৎসা :
মানুষের রোগ ব্যাধির মধ্যে মলদ্বারের রোগেই সবচেয়ে বেশি স্ব-চিকিৎসা এবং হাতুড়ে চিকিৎসা হয়। কিছুটা ভয় এবং বিব্রতকর অনুভূতির জন্য এ জাতীয় রোগ হলে রোগীরা ডাক্তার দেখাতে চান না। রোগীরা নিজে নিজে অথবা সস্তায় পাওয়া হাতুড়ে চিকিৎসকের কাছে যান বেশি। বিভিন্ন কুসংস্কার এবং মলদ্বারের সব রোগই পাইলস এই ভ্রান্ত ধারণার কারণে চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরী করেন যা কখনও কখনও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। হয় রোগটি শুরু থেকেই ক্যান্সার অথবা অবহেলার কারণে ইতোমধ্যে সেখানে ক্যান্সার হয়ে গেছে। পাইলসের প্রাথমিক উপসর্গের মধ্যে রয়েছে টয়লেটে রক্ত যাওয়া, মাংসপিন্ড ঝুলে পড়া ও ব্যথা হওয়া এবং পাইলসে ব্যথা হলে তার কারণ হচ্ছে থ্রম্বোসিস, পঁচনধরা (গ্যাংথ্রিন) বা ঘা হয়ে যাওয়া।  দ্বিতীয় ক্ষেত্রে অপারেশনই যথাযথ চিকিৎসা।  প্রাথমিক ক্ষেত্রে যখন টয়লেটে টাটকা লাল রক্ত যায় এবং বাইরে কোনো বড় ধরনের মাংপপিন্ড ঝুলে না থাকে সেক্ষেত্রে ওষুধ ও পথ্যের মাধ্যমে চিকিৎসা করলে  দ্রুত  আরোগ্যলাভ হয়ে থাকে। তবে চিকিৎসককে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষার মাধ্যমে অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে যে কি কারণে রক্ত যাচ্ছে। বিশেষ করে পায়ুপথের ভেতর কোনোরূপ ক্যান্সার আছে কি না। যে রোগীরা পাইলসে ভোগেন তাদের সাধারণত কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া জাতীয় সমস্যা থাকে। অনেক রোগী আছেন যাদের পেটে গ্যাস হয়। পায়খানার সাথে মিউকাস বা আম যায়। পায়খানা করার পর মনে হয় ক্লিয়ার হয়নি। দুধ, পোলাউ, ঝাল, গরুর মাংস ইত্যাদি খেলে হজমে গোলমাল হয়। টয়লেটে অনেকক্ষণ বসে থাকতে হয়। অনেকে মলদ্বারের ভেতর আঙ্গুল দিয়ে মলত্যাগ করেন। রোগীরা এ সমস্যাগুলোকে গ্যাস্ট্রিক বা ক্রনিক আমাশয় হিসেবে মনে করেন। চিকিৎসা পরিভাষায় একে আমরা বলি ‘ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রাম’ বা ‘আইবিএস’। এ জাতীয় রোগীদের দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, পোলাউ, ঝাল, বিরিয়ানি খাওয়া নিষেধ। উপদেশ : পাইলসে যে দুটি রোগ সবচেয়ে বেশি সমস্যা করে তা হলো কোষ্ঠকাঠিন্য ও ডায়রিয়া। বেশির ভাগ রোগীর খাদ্যাভ্যাসে ত্রুটি থাকে এবং মলদ্বার ভালভাবে পরিষ্কার রাখেন না। যদি রোগীর নরম পায়খানা, চুলকানি ও সামান্য রক্ত যায় তাহলে তাকে আঁশ জাতীয় খাবার দেয়া যেতে পারে। ডায়রিয়া হয় এমন খাবার পরিহার করতে হবে। মলত্যাগের পর মলদ্বার ভালভাবে পানি দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। পাইলস রোগীদের তিনটি    কু-অভ্যাস দেখা যায়  : ১. যেভাবেই হোক প্রতিদিন অন্তত একবার পায়খানা করতে হবেই। এটি না হলে তারা সারাদিন শারীরিক ও মানসিক টেনশনে ভোগেন। ২. সকাল বেলা প্রথমবার যখন মলত্যাগের বেগ হয় তখন তাতে সাড়া দেন না। ৩. পায়খানা ক্লিয়ার হযনি ভেবে টয়লেটে অনেকক্ষণ বসে থাকেন এবং কোথ দেন যেন রেকটাম থেকে পায়খানা সম্পূর্ণরূপে বের হয়ে যায়। তাদের বিশ্বাস এই যে যদি সামান্য মল ভেতরে থেকে যায় তাহলে সারাদিন অস্বস্তিতে কাটাতে হবে। খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন  : আমরা প্রচুর রোগী পাই বিশেষ করে শিশুদের সঠিক খাদ্যাভ্যাসের অভাবে পায়ুপথের বিভিন্ন রোগ হয়। পায়খানার পরিমাণ বাড়ে এমন খাবার খাওয়া উচিত। যেমন শাক, সবজি, সালাদ, ফল, ইসুপগুলোর ভূষি, গমের ভূষি ইত্যাদি। দৈনিক পরিমিত পানীয় খেতে হবে। একজন পূর্ণ বয়স্ক লোকের জন্য ৬-৮ গ্লাস পানি প্রতিদিন পান করতে হবে। অনেক রোগীকে এসব উপদেশ দিলে তারা ক’দিন পরে ভুলে যান অথবা আবার ঐ চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার ক’দিন আগে আবার খান যাতে তাকে বলতে পারেন যে হ্যাঁ, আমি ভূষি বা সালাদ খেয়েছি। ইসুপগুলের ভূষি দোকানে পাওয়া যায় আবার ওষুধ কোম্পানিও বানায়।মোট কথা সচেতনতাই পারে পাইলস বা মলদ্বারের বিভিন্ন রোগ হতে আমাদের বাচাতে, মনে রাখবেন আরোগ্যর চেয়ে প্রতিরোধ ভালো।পাইলস সম্পর্কে নিজে জানুন,পরিবারকে জানান। লেখক : ডাঃ একেএম ফজলুল হক সিদ্দিকী (কলামিস্ট, গবেষক,চিকিৎসক -পাইলস  এন্ড  কলোরেক্টাল  ডিজিজ)

Check Also

মলদ্বার বা পায়ুপথের নানান ব্যাধি :

মলদ্বারে বা পায়ুপথে নানাবিধ কারণে ব্যথা হয়ে থাকে। পায়ুপথের ব্যথার প্রধান কারণগুলো হচ্ছে (১) পায়খানার …