Home / আর্টিক্যাল/ব্লগ / ভগন্দর বা এনাল ফিস্টুলায় অবহেলা নয় :

ভগন্দর বা এনাল ফিস্টুলায় অবহেলা নয় :

ফিস্টুলা বা ভগন্দরের শাব্দিক অর্থ হলো চিরনালী ক্ষত।যেহেতু ফিস্টুলা তথা ভগন্দর একবার কারো হলে এক্ষত সহজে ভালো হতে চায় না সেহেতু লোকজন এক্ষত কে চিরনালী ক্ষত হিসাবে আক্ষায়িত করে। ফিস্টুলা তথা চিরনালী ক্ষত শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে হতে পারে, শরীরের যে অঙ্গে হবে সে অঙ্গের নামানুসারে ফিস্টুলার নামকরণ হয়ে থাকে।আমাদের আজকের বিষয় হলো এনাল ফিস্টুলা তথা মলদ্বারের ভগন্দর বা মলদ্বারের চিরনালী ক্ষতের ক্ষেত্রে মলদ্বারে ক্যানসারের ঝুঁকি কতটুকু। প্রায় ৩০০০ বছর আগের বই-পুস্তকেও ফিস্টুলা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। সাধারণত মলদ্বারের পাশের গ্রন্থি (Anal gland) বন্ধ ও সংক্রমিত হয়ে বিষফোঁড়া হয় এবং এ বিষফোঁড়া ফেটে গিয়ে চিরনালী ক্ষত তৈরি করে। মলদ্বারে বিষফোঁড়া হওয়া রোগীদের প্রায় শতকরা ৬০ ভাগ রোগীর ফিস্টুলা হয়ে থাকে। অনেক সময় ফিস্টুলা এবং বিষফোঁড়া একই সঙ্গে প্রকাশ পায়। এছাড়া মলদ্বারের যক্ষা(TB), বৃহদন্ত্রের প্রদাহ এবং মলদ্বারের ক্যান্সার থেকেও ফিস্টুলা হয়ে থাকে। শিশুদের সাধারণত ফিস্টুলা কম হয়। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে প্রতি এক লক্ষ লোকের মধ্যে আট থেকে নয় জন এবং প্রতি একশো জন মলদ্বারের রোগীর মধ্যে দশজন  ফিস্টুলা তথা চিরনালী ক্ষত রোগে আক্রান্ত। মহিলাদের তুলনায় পুরুষরা প্রায় তিনগুণ বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকেন।

প্রায়ক্ষেত্রে রোগীরা মলদ্বারে ব্যথা, মলদ্বারের পাশে ফোলা এবং নিজে থেকে ফেটে গিয়ে পুঁজ-পানি ঝরা কিংবা বিষফোঁড়ার জন্যে আগের অপারেশনের ইতিহাস নিয়ে চিকিৎসকের কাছে আসেন। পুঁজ-পানি পড়লে ব্যথা কমে যায় এবং রোগী সাময়িক আরাম বোধ করেন এবং কিছুদিনের জন্যে রোগী ভালো হয়ে যান। রোগটি দুই-তিন  সপ্তাহ বা দু এক মাস সুপ্ত থেকে আবার দেখা যায়।

সুপ্তাবস্থায় রোগী ভাবেন যে তিনি ভালো হয়ে গেছেন ফলে চিকিৎসকের কাছে আসেন না। অনেক রোগী দেখা যায় ব্যথার সময় এলাকার ফার্মেসী থেকে অ্যান্টিবায়োটিক এবং ব্যথার ওষুধ কিনে খান। ব্যথা ভালো হলে ভুলে যান। এভাবে চক্রাকারে বছরের পর বছর চলতে থাকে। প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকে ইউনানী-আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসাও নেন। ফিস্টুলা যেহেতু একটি নালী নির্ভর ব্যাধি তাই এর একাধিক মুখ থাকে, একটি মলদ্বারের ভেতরে অপরটি মলদ্বারের বাহিরে। নালিটির গতিপথের উপর ভিত্তি করে আমেরিকান গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন ফিস্টুলাকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। একটি সরল ফিস্টুলা অন্যটি জটিল।

সরল ফিস্টুলা: যে ফিস্টুলার নালীপথ বা মুখ মলদ্বারের মাংসপেশির গভীরে প্রবেশ করেনা তাকে সরল ফিস্টুলা বলে। এক্ষেত্রে মলদ্বারের মাংসপেশি অল্প সম্পৃক্ত হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একেবারেই হয় না।

জটিল ফিস্টুলা: যে ফিস্টুলার নালীপথ বা মুখ  মলদ্বারের গভীরে প্রবেশ করে বা ফিস্টুলার শাখা-প্রশাখা রয়েছে অথবা ফিস্টুলার সঙ্গে অন্যান্য অঙ্গের যেমন – মুত্রথলি, জরায়ু, যোনিপথের সংযোগ রয়েছে তাকে জটিল ফিস্টুলা বলে। জটিল ফিস্টুলার ক্ষেত্রে মলদ্বারের মাংসপেশি বেশি পরিমাণে সম্পৃক্ত হয়। অপারেশনের পর পুনরায় হওয়া ফিস্টুলা, মলদ্বারের যক্ষা, বৃহদন্ত্রের প্রদাহ এবং মলদ্বারের ক্যান্সার থেকে হওয়া ফিস্টুলা সাধারনত জটিল ফিস্টুলা হয়ে থাকে। অনেক সময় এ ধরনের ফিস্টুলার ক্ষেত্রে বাইরে একাধিক মুখ থাকতে পারে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চিকিৎসক রোগীর সমস্যা শুনে, মলদ্বার দেখে ও মলদ্বারে আঙুল দ্বারা পরীক্ষা করে ফিস্টুলা রোগটি নির্ণয় করেন। মলদ্বারের যক্ষা, বৃহদন্ত্রের প্রদাহ এবং মলদ্বারের ক্যান্সার থেকে ফিস্টুলার সন্দেহ করলে চিকিৎসকরা কোলনোস্কপি করে থাকেন। এছাড়া জটিল ফিস্টুলার ক্ষেত্রে বর্তমানে আক্রান্ত স্হানের টিসু নিয়ে বায়োপসি পরীক্ষা, এম,আর,আই, মলদ্বারের ভেতরের আল্ট্রাসনোগ্রাফি,ফিস্টুলোগ্রাম ইত্যাদি পরীক্ষা নিরীক্ষা করে অতি সহজেই ফিস্টুলার ধরণ,জটিলতা, অবস্থা নির্ণয় করা যায়। ফিস্টুলার চিকিৎসায় অপারেশন ছাড়াও বিশ্বব্যাপি বহু পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে। তবে কোনটি শ্রেষ্ঠ বা যথাযথ সে বিষয়ে চিকিৎসকরা এখনও ঐক্যমতে পৌঁছতে পারেন নি। বর্তমানে বিশ্বব্যাপি ফিস্টুলা চিকিৎসার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত অপারেশন পদ্ধতিগুলো হচ্ছে-(১) ফিস্টুলোটোমি (২) ফিস্টুলেকটোমি (৩) সিটন পদ্ধতি (৪) ফিস্টুলা প্লাগ(৫) ফিস্টুলা গ্লু (৬) ফ্ল্যাপ ব্যবহার (৭) রেডিওফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার (৮) লেজার ব্যবহার (৯) স্টেম সেল ব্যবহার (১০) মলদ্বারের মাংসপেশির মাঝখানের নালি বন্ধ করে দেওয়া (১১) এন্ডোস্কোপিক ফিস্টুলা সার্জারি ইত্যাদি।

এগুলোর মধ্যে প্রথম তিনটি বহূল ব্যবহৃত। বাকিগুলো বিশেষ ক্ষেত্রে কিংবা অতি জটিল ফিস্টুলার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। পদ্ধতি যাই হোক না কেনো ফিস্টুলার চিকিৎসার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে যেমন- সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, ফিস্টুলার নালিটি বন্ধ করা এবং মলবেগ ধরে রাখার ক্ষমতা বজায় রাখা। ফিস্টুলা চিকিৎসার অন্যতম দিক হলো অপারেশনের পর ফিস্টুলার পুনরাবৃত্তি না ঘটা এবং মলবেগ ধরে রাখার ক্ষমতা বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা।

সাধারণত দেখা যায় যে ফিস্টুলা অপারেশনের পর আবার হতে পারে বা হয়। বিশ্বব্যাপী বিশেষজ্ঞদের মতে অপারেশনের পর সরল ফিস্টুলা পুনরায় হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা দশ থেকে বিশ ভাগ। জটিল ফিস্টুলার ক্ষেত্রে এটি শতকরা ৪০ থেকে ৬০ ভাগ পর্যন্ত হতে পারে। তবে ফিস্টুলা অপারেশনের পর পুনরায় হবে কি হবে না এ ব্যাপারে কোন সার্জন নিশ্চয়তা দিতে চায় না। ফিস্টুলার ধরন, সার্জনের অভিজ্ঞতা এবং অপারেশনের পরের যত্নের উপর ফিস্টুলা অপারেশনের সফলতা বহুলাংশে নির্ভর করে।তবে সচরাচর ফিস্টুলা হতে মলদ্বারে ক্যান্সার হবার ঝুঁকি মলদ্বারের অন্যান্য রোগ যেমন – রেকটাল পলিপ,কোলোনিক পলিপ-আলসার,ইন্টারনাল পাইলস,এনাল ফিসার ইত্যাদির তুলনায় বেশ কম। তাই বলে এনাল ফিস্টুলার চিকিৎসায় অযত্ন, অবহেলা, সময়ক্ষেপণ কিংবা হাতুড়ে চিকিৎসার কোন সুযোগ নেই। বিশ্বব্যাপি জনপ্রিয় হলিস্টিক চিকিৎসা পদ্ধতি হিসাবে হোমিওপ্যাথি এনাল ফিস্টুলার চিকিৎসায় অত্যন্ত কার্যকর। ফিস্টুলার যেকোনো জটিল বা সরল অবস্থায় রোগীর রোগ লক্ষণ অনুযায়ী সমবিধান মতে চিকিৎসা দিলে এনাল ফিস্টুলা বিনা কষ্টে অত্যন্ত সহজে খুব দ্রুততম সময়ে স্হায়ীভাবে আরোগ্য সাধিত হয়। তাই সময় নষ্ট না করে একজন রেজিস্টার্ড হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হোন। লেখক : ডাঃ একেএম ফজলুল হক সিদ্দিকী (পাইলস,ফিস্টুলা,ফিসার সহ মলদ্বারের যাবতীয় রোগ বিশেষজ্ঞ ও কলামিস্ট)।

Check Also

মলদ্বার বা পায়ুপথের নানান ব্যাধি :

মলদ্বারে বা পায়ুপথে নানাবিধ কারণে ব্যথা হয়ে থাকে। পায়ুপথের ব্যথার প্রধান কারণগুলো হচ্ছে (১) পায়খানার …